ভাড়াটিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বাহারানে সুলতান
Newsvob.com অনলাইন ডেস্কঃ বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মাসুদ রানা। দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে পুরান ঢাকায় ভাড়া থাকেন। করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে বাসায় অবস্থান করছেন তিনি। মাসুদ রানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোমতে ঘরে আছি। আমার অফিস বন্ধ। বেতন পাইনি। ঘর ভাড়া দেওয়ার টাকা হাতে নেই। ঘরভাড়া দেওয়া নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।’
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি সিদ্ধান্তে ঢাকাসহ সারা দেশের মানুষ এখন ঘরবন্দী। এতে নিম্ন আয়ের মানুষ বিপদে পড়েছেন। হাতে কাজ নেই, বেকার হয়ে ঘরবন্দী। ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাঁরা ঘরভাড়া নিয়ে বসবাস করছেন, তাঁদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।ভাড়াটিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বাহারানে সুলতান বলেন, ‘আমরা ভাড়াটেরা বড় বিপদে আছি। করোনাভাইরাসের কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের ও মধ্যবিদে হাতে টাকা নেই। কিন্তু বাড়িওয়ালারা তো আর তা বুঝতে চাইবেন না। এমন মহামারির সময় সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, সরকার যেন তিন মাসের (এপ্রিল, মে ও জুন মাস) বাড়িভাড়া মওকুফের ঘোষণা দেয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার কয়েকজন বাড়িওয়ালা জানান , ভাড়ার টাকায় বহু বাড়িওয়ালার সংসার চলে। যদি ভাড়াটেরা বাড়িভাড়া না দেন, তাহলে কীভাবে তাঁরা সংসার চালাবেন? আবার ঋণ নিয়ে বহু মালিক বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সেই ঋণের টাকা তো মাসে মাসে পরিশোধ করতে হয়।
মহামারির এই সময়ে নিম্ন আয়ের যেসব মানুষের বাড়িভাড়া দেওয়ার সংগতি নেই, তাঁদের যেন কোনোভাবে বাসা থেকে বের করে না দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে সরকারি হস্তক্ষেপ দরকার বলে মনে করেন দেশের বিশিষ্টজনেরা। তাঁরা মনে করেন, দুপক্ষকেই মানবিক হতে হবে। বাড়িওয়ালার উচিত হবে না ভাড়াটেকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া বা ভাড়ার জন্য চাপ দেওয়া। তেমনি ভাড়াটেকেও চেষ্টা করতে হবে সংকট উত্তরণের পর ভাড়া পরিশোধ করা। তা ছাড়া সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষকে আর্থিক সহায়তা করা।
করোনাভাইরাসের এই মহামারির সময়ে ভাড়া দেওয়া নিয়ে ভাড়াটে ও বাড়িওয়ালার মধ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটার সমাধান কিন্তু সরকারকে করতে হবে। এই সময়ে যাঁরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, যাঁরা নিম্ন আয়ের মানুষ, তাঁরা বাড়িভাড়ার টাকা কোত্থেকে দেবেন? এসব দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় জরুরি ভিত্তিতে এককালীন হলেও অন্তত দু-তিন মাসের জন্য আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।
কাউকে বাড়ি থেকে বের করা যাবে না
কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ, যাঁরা বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না, তাঁদের কাউকে যেন ঘর থেকে বের না করে দেওয়া হয়, সেই আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা।
আর ঢাকার সাংসদ ও জাতীয় পার্টির নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ তো চিন্তা করতে পারেননি, হঠাৎ করে মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়বেন, বেকার হয়ে পড়বেন। ভাড়া না দেওয়ার কারণে আমার এলাকায় যাতে কাউকে বাসা থেকে বের না করে দেওয়া হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছি। এখন পর্যন্ত আমার এলাকায় তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
আর্থিকভাবে সচ্ছল বাড়িওয়ালাদের ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারে চাপ না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা জানি, অনেক বাড়িওয়ালা কিন্তু ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন। তারপরও আমি বলব, বাড়িভাড়া না দিতে পারার জন্য কোনো ভাড়াটেকে যেন বের না করে দেওয়া হয়। বাড়িওয়ালাদের বিষয়টি কনসিডার করতে হবে। ভাড়াটে এবং মালিককে একটা আলোচনা করেই সমাধানের পথে আসতে হবে।’
মেয়র আতিকুল জানান, খুব শিগগির ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটের তথ্যভান্ডার তৈরি করবে। নিম্ন আয়ের যেসব মানুষ ভাড়া দিতে পারছেন না, সে ব্যাপারে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। যাঁরা নীতিনির্ধারক, তাঁদের সঙ্গে আলাপ করতে হবে।
আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘এই সময়ে হঠাৎ করেই তো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, এটা তো সত্য। যে মানুষটা কর্মহীন, তিনি তো সাত দিন আগেও ভাবতে পারেননি তিনি এভাবে কর্মহীন হতে পারেন। মানবিক দিক থেকে ভাড়া মওকুফ হতেই পারে। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা তো এটা করতে পারেন।’
সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বাড়িভাড়া দিতে না পারা নিম্ন আয়ের মানুষকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টা অনেক স্পর্শকাতর। সোশ্যাল সেফটির সব টাকা তো করোনাভাইরাসের জন্য আমরা কাজ করছি। উই হ্যাভ ডাইভার্ট অল দ্য অ্যামাউন্ট ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব করোনাভাইরাস। এখন তো আমাদের যারা পথশিশু, বিচ্ছিন্ন মানুষ, ভবঘুরে, যারা রাজধানীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের আমরা খাওয়াচ্ছি, পরাচ্ছি। তবে এ বিষয়টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনব। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করব।’
সূত্র: প্রথম আলা