ঢাকা , শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
Logo মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীনের ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার ঋণ Logo মোদি সরকারের মাথাব্যথা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, কংগ্রেসের বাইরেও বাড়ছে চাপ Logo ১৫ বছর পর আবারও একসঙ্গে শাহরুখ-কারিনা, ‘কিং’-এ বিশেষ চমক Logo একনেকে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন Logo কর্মসংস্থান বাড়াতে ডিসেম্বরে দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের প্রাথমিক কার্যক্রম: মাহ্দী আমিন Logo কুবিতে গবেষণা বিষয়ক ‘আনোয়ার হোসাইন মেমোরিয়াল গণিত সেমিনার’ অনুষ্ঠিত Logo প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ ভাষণের প্রশংসায় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ Logo দিনভর প্রশাসনের তৎপরতা, জলাবদ্ধতায় থামেনি নগরবাসীর দুর্ভোগ Logo প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন কতজন Logo জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন তারেক রহমান

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ ভাষণের প্রশংসায় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ

  • প্রতিনিধির নাম :
  • আপডেট এর সময় : ০৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ১২৭ বার পঠিত হয়েছে
নিউস ভয়েস অফ বাংলাদেশ :    জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তারেক রহমান তার ভাষণে বাংলাদেশ পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতায় দেশের ভূমিকা জোরদার করার একটি বিস্তৃত পথরেখা তুলে ধরেন।

জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমন এক বিপর্যস্ত দেশের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ভাষণ দিয়েছেন।

এই অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশ পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের কাঠামো হিসেবে সরকারের থ্রি-আর কৌশল—রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনঃস্থাপন) ও রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)—উপস্থাপন করেছেন।

তিনি বলেন, এ কৌশল বাস্তবায়নে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে উন্নয়নে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তিন শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়াতে হবে।

মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝাও ক্রমে বেড়েছে। আগামী বছরগুলোতে সুদ পরিশোধ ও ঋণের কিস্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ঋণ নেওয়া কোনো সমস্যা নয়, যদি সেই ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা হয় এবং তা দেশের অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনে।’

জাতীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন বলেও জানান তিনি।

একইসঙ্গে মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে বিদেশি সহায়তাকে প্রধান উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেননি। বরং তিনি দেশের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটিকে তিনি একটি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান একটি ‘বাড়তি চাপ’। তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে করা আগের আশ্বাসগুলোর কোনটিই টেকসই সমাধান আনতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আগেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। তবে কয়েকটি কারণে এবারের ভাষণটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো।’

ড. কাজী মাহবুবুর রহমানও জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী সক্রিয়ভাবে জনগণের ক্ষমতায়নের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছে, আর বাংলাদেশের জনগণকে ক্ষমতায়িত করার প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেশের অভ্যন্তরীণ একটি প্রধান অগ্রাধিকারকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘থ্রি-আর’ (৩-আর) কৌশল এবং যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি বাংলাদেশের বিরোধিতাই শান্তি ও পুনর্গঠনের প্রতি দেশের অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, তাঁর ভাষণে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোরালো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলা জাতীয় দৈনিক ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা ও রক্তপাতের এই সময়ে বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশের আকাঙক্ষার জোরালো বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ভাষণটিকে বর্ণনা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর উক্তি- ‘ঘাতক অস্ত্র নয়, পৃথিবী বদলাবে মানবতায়’- উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ভাষণটি শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিন সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, এই সমস্যার সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি এবং গোটা বিশ্বে নিরাপত্তা অর্জন করা কঠিনই থেকে যাবে।

মারুফ কামাল বলেন, তারেক রহমান পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, শিশু স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি আরো বলেন, জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চরম ঝুঁকির কারণে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বাংলায় দেওয়া ১৭ মিনিটের এই ভাষণে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং শক্তিশালী বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশগত সমস্যা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মতো বাংলাদেশের মূল উদ্বেগের বিষয়গুলোর প্রতিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

আবদাল আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী জুলাই আন্দোলন এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

তিনি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ হিসেবে সরকারের ‘থ্রি-আর’ (৩-আর) কৌশল উপস্থাপন করেন।

প্রধানমন্ত্রী সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন এবং সামরিক খাতের ব্যয় উন্নয়নমূলক খাতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে আবদাল আহমদ উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর জিয়া পরিবারের কোনো সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটি ছিল বাংলায় দেওয়া তৃতীয় ভাষণ, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে এই পরিবারের গভীর সম্পৃক্ততাকে ফুটিয়ে তুলেছে।

বাসসের প্রতিবেদনে উঠে আসা জনমত অনুযায়ী, বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামজিদ বলেন, এই ভাষণটি তার প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেছে, যা তাকে গর্বিত করেছে।

রাজধানীর নীলক্ষেতের দোকানি মোহাম্মদ শাহীন বলেন, সাধারণ বাংলাদেশিদের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছেন- বিষয়টি তার ভালো লেগেছে।

পথচারী মোহাম্মদ জসিমও বাংলাদেশের মর্যাদা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রোহিঙ্গা সংকটের ওপর ভাষণে দেওয়া গুরুত্বের জন্য গর্ব প্রকাশ করেন।

একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রী দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপের দরজা খোলা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে যেকোনো সমস্যার সমাধান সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

সূত্র: বাসস

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

News VOB

মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীনের ৩ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার ঋণ

প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ ভাষণের প্রশংসায় সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষ

আপডেট এর সময় : ০৯:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিউস ভয়েস অফ বাংলাদেশ :    জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।

তারেক রহমান তার ভাষণে বাংলাদেশ পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বৈশ্বিক শান্তি ও সহযোগিতায় দেশের ভূমিকা জোরদার করার একটি বিস্তৃত পথরেখা তুলে ধরেন।

জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এমন এক বিপর্যস্ত দেশের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ ভাষণ দিয়েছেন।

এই অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দেশ পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের কাঠামো হিসেবে সরকারের থ্রি-আর কৌশল—রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনঃস্থাপন) ও রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)—উপস্থাপন করেছেন।

তিনি বলেন, এ কৌশল বাস্তবায়নে ব্যাপক অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন হবে। মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে উন্নয়নে অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত তিন শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়াতে হবে।

মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝাও ক্রমে বেড়েছে। আগামী বছরগুলোতে সুদ পরিশোধ ও ঋণের কিস্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে ঋণ নেওয়া কোনো সমস্যা নয়, যদি সেই ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা হয় এবং তা দেশের অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনে।’

জাতীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কারও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন বলেও জানান তিনি।

একইসঙ্গে মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে বিদেশি সহায়তাকে প্রধান উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেননি। বরং তিনি দেশের নিজস্ব প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটিকে তিনি একটি ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান একটি ‘বাড়তি চাপ’। তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দীর্ঘদিনেও সমাধান না হওয়ায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। তাই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সম্পৃক্ততার কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এখন আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছে।

তিনি আরও বলেন, প্রত্যাবাসন নিয়ে করা আগের আশ্বাসগুলোর কোনটিই টেকসই সমাধান আনতে পারেনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে রোহিঙ্গা ইস্যুটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীরা আগেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। তবে কয়েকটি কারণে এবারের ভাষণটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হলো।’

ড. কাজী মাহবুবুর রহমানও জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী সক্রিয়ভাবে জনগণের ক্ষমতায়নের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করে আসছে, আর বাংলাদেশের জনগণকে ক্ষমতায়িত করার প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেশের অভ্যন্তরীণ একটি প্রধান অগ্রাধিকারকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘থ্রি-আর’ (৩-আর) কৌশল এবং যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি বাংলাদেশের বিরোধিতাই শান্তি ও পুনর্গঠনের প্রতি দেশের অঙ্গীকারকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, তাঁর ভাষণে সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোরালো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বাংলা জাতীয় দৈনিক ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মারুফ কামাল খান বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা ও রক্তপাতের এই সময়ে বিশ্বশান্তির জন্য বাংলাদেশের আকাঙক্ষার জোরালো বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ভাষণটিকে বর্ণনা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর উক্তি- ‘ঘাতক অস্ত্র নয়, পৃথিবী বদলাবে মানবতায়’- উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ভাষণটি শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন এবং দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিন সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, এই সমস্যার সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি এবং গোটা বিশ্বে নিরাপত্তা অর্জন করা কঠিনই থেকে যাবে।

মারুফ কামাল বলেন, তারেক রহমান পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন, নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, শিশু স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।

তিনি আরো বলেন, জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের চরম ঝুঁকির কারণে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, বাংলায় দেওয়া ১৭ মিনিটের এই ভাষণে বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং শক্তিশালী বহুপক্ষীয় সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশগত সমস্যা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংস্কারের মতো বাংলাদেশের মূল উদ্বেগের বিষয়গুলোর প্রতিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

আবদাল আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী জুলাই আন্দোলন এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

তিনি রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ হিসেবে সরকারের ‘থ্রি-আর’ (৩-আর) কৌশল উপস্থাপন করেন।

প্রধানমন্ত্রী সামরিক শক্তির পরিবর্তে কূটনৈতিক সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন এবং সামরিক খাতের ব্যয় উন্নয়নমূলক খাতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে আবদাল আহমদ উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পর জিয়া পরিবারের কোনো সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটি ছিল বাংলায় দেওয়া তৃতীয় ভাষণ, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে এই পরিবারের গভীর সম্পৃক্ততাকে ফুটিয়ে তুলেছে।

বাসসের প্রতিবেদনে উঠে আসা জনমত অনুযায়ী, বিশ্বমঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর বাংলায় বক্তব্য রাখার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামজিদ বলেন, এই ভাষণটি তার প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেছে, যা তাকে গর্বিত করেছে।

রাজধানীর নীলক্ষেতের দোকানি মোহাম্মদ শাহীন বলেন, সাধারণ বাংলাদেশিদের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরেছেন- বিষয়টি তার ভালো লেগেছে।

পথচারী মোহাম্মদ জসিমও বাংলাদেশের মর্যাদা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং রোহিঙ্গা সংকটের ওপর ভাষণে দেওয়া গুরুত্বের জন্য গর্ব প্রকাশ করেন।

একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রী দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষম একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপের দরজা খোলা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি যে যেকোনো সমস্যার সমাধান সংলাপ, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

সূত্র: বাসস