পলিটিক্যাল ব্রেকআপ ও বর্তমান বাংলাদেশ

রাজনীতি ডেস্ক: রাজনৈতিক মতপার্থক্যের জেরে বন্ধু, পরিবার কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক মতের অমিলের কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক হারিয়েছেন। মূলত রাজনৈতিক পরিচয়ের বিভাজন এখন কেবল দলীয় সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা মানুষের প্রাত্যহিক সামাজিক জীবনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বিভাজনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং এটি বহুস্তরবিশিষ্ট। স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সরকার গঠন, আন্দোলন এবং সংঘাতের মধ্য দিয়ে এই বিভক্তি ধীরে ধীরে আরও পোক্ত হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দলের উত্থান-পতনের প্রক্রিয়ায় ছাত্র, শ্রমিকসহ নানা পেশাজীবী শ্রেণির মানুষ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এর ফলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংগঠনিক পর্যায়ে নয়, বরং ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এবং পারিবারিক পর্যায়েও রাজনৈতিক বিচ্ছেদের মতো ঘটনা ঘটছে।

দলীয় রাজনীতির প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং অন্য পক্ষকে তীব্রভাবে অপছন্দ করার সংস্কৃতি সমাজে এক ধরনের অসহিষ্ণু পরিবেশ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ কিংবা বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে নিরপেক্ষভাবে কোনো ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা করতে দ্বিধাবোধ করেন। বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা নিজ নিজ দলের বা নেতার কর্মকাণ্ডের দায় এড়াতে চান এবং অতীতের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেন। ফলস্বরূপ, সমাজজুড়ে এক ধরনের মেরুকরণ তৈরি হয়েছে যেখানে সবার জন্য মুক্ত আলোচনার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে।

শুধু রাজনৈতিক অঙ্গন বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নয়, বরং জনপ্রশাসন, আদালত ও গণমাধ্যমের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতেও দলীয় পরিচয়ের প্রভাব লক্ষ করা যায়। যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক রঙকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ সুযোগবঞ্চিত হওয়ার ভয়ে অনেক সময় নীরব থাকতে বাধ্য হন অথবা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রাখেন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই বিভাজন ও দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করছে।

দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মানসিকতা ফিরিয়ে আনা এবং সমাজের ভেতরের এই অনভিপ্রেত দূরত্ব কমানো বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক আলোচনা বা বিতর্ক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে, তবে তা যেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট না করে। একটি সুষম ও সহনশীল সমাজ বিনির্মাণের স্বার্থে দলীয় অন্ধত্ব কাটিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও গঠনমূলক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

সংবাদটি শেয়ার করে অন্য জানার সুযোগ দিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *