ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারের ডিলারে স্বজন তোষণ

জাতীয় ডেস্ক: কৃষকদের দোরগোড়ায় সহজে ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, কৃষি কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এবং সার ব্যবসার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতা ও কৃষি কর্মকর্তাদের আত্মীয়স্বজনদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতার কথা বলা হলেও বিরোধী দল, ভুক্তভোগী কৃষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে নিজেদের আর্থিক স্বার্থরক্ষার জন্য বাজারে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করতে পারেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের একটি বড় অংশের নিজস্ব গুদাম বা সার বিক্রির প্রয়োজনীয় সক্ষমতাও নেই। যশোরের চৌগাছা উপজেলায় অনুমোদিত ডিলারদের তালিকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী ও স্বজনদের নাম রয়েছে, যেখানে পূর্বে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আবেদনকারীরা বাদ পড়েছেন। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ময়মনসিংহের গফরগাঁও এবং কুড়িগ্রাম জেলায়, যেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলের প্রভাবশালী নেতাদের পরিবার এবং ঘনিষ্ঠজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় যুবদল, ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাদের স্ত্রী ও সন্তানরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। এমনকি বরিশালের বানারীপাড়ায় কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই স্থানীয় এক নেতার দুই ভাই ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। নোয়াখালীতে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে নিজের বাবাকে ডিলার করানোর অভিযোগও উঠেছে।

সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির এই অভিযোগ কেবল মাঠপর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন যে প্রতিটি ডিলারশিপ প্রদানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অনৈতিক লেনদেন হয়েছে এবং লটারিতে এগিয়ে থেকেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে, মৌলভীবাজার ও সাতক্ষীরা জেলায় নতুন ডিলারের বড় একটি অংশই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের অনুসারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের এই অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ ও কৃষি খাতের কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে সম্পূর্ণ নীতিমালার আলোকেই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বাছাই কমিটির সুপারিশকে প্রাধান্য দিয়েই এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তিন সদস্যের কমিটি পুরো ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া, সার বিতরণ এবং মজুত ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

admin 12

জনপ্রিয় সংবাদ

সারের ডিলারে স্বজন তোষণ

আপডেট এর সময় : ৫১ মিনিট আগে

জাতীয় ডেস্ক: কৃষকদের দোরগোড়ায় সহজে ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন করে সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, কৃষি কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন এবং সার ব্যবসার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এমন ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতা ও কৃষি কর্মকর্তাদের আত্মীয়স্বজনদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতার কথা বলা হলেও বিরোধী দল, ভুক্তভোগী কৃষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে নিজেদের আর্থিক স্বার্থরক্ষার জন্য বাজারে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করতে পারেন।

দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের একটি বড় অংশের নিজস্ব গুদাম বা সার বিক্রির প্রয়োজনীয় সক্ষমতাও নেই। যশোরের চৌগাছা উপজেলায় অনুমোদিত ডিলারদের তালিকায় স্থানীয় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী ও স্বজনদের নাম রয়েছে, যেখানে পূর্বে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আবেদনকারীরা বাদ পড়েছেন। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ময়মনসিংহের গফরগাঁও এবং কুড়িগ্রাম জেলায়, যেখানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও দলের প্রভাবশালী নেতাদের পরিবার এবং ঘনিষ্ঠজনদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায় যুবদল, ছাত্রদল ও বিএনপি নেতাদের স্ত্রী ও সন্তানরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। এমনকি বরিশালের বানারীপাড়ায় কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই স্থানীয় এক নেতার দুই ভাই ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। নোয়াখালীতে এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে নিজের বাবাকে ডিলার করানোর অভিযোগও উঠেছে।

সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতির এই অভিযোগ কেবল মাঠপর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুরে স্থানীয় এক বিএনপি নেতা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন যে প্রতিটি ডিলারশিপ প্রদানে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার অনৈতিক লেনদেন হয়েছে এবং লটারিতে এগিয়ে থেকেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে, মৌলভীবাজার ও সাতক্ষীরা জেলায় নতুন ডিলারের বড় একটি অংশই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের অনুসারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে এবং সার বিতরণব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের এই অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ ও কৃষি খাতের কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে সম্পূর্ণ নীতিমালার আলোকেই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বাছাই কমিটির সুপারিশকে প্রাধান্য দিয়েই এই তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের মাত্রা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং ডিলার নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই তিন সদস্যের কমিটি পুরো ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া, সার বিতরণ এবং মজুত ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখবে বলে জানা গেছে।